শুক্রবার, ০১ মার্চ ২০২৪, ০৫:৪৮ পূর্বাহ্ন
                                           

নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচন, শত অভিযোগ ও নানা উদ্বেগ

জাতীয় নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণা শুরুর পর থেকে সহিংসতা ও হামলা-ভাঙচুরের যত অভিযোগ উঠেছে তার অধিকাংশই করছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা, যাদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা।

বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় এবার নৌকার বিপরীতে আওয়ামী লীগের নেতারাই বেশিরভাগ জায়গায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন এবং তাদেরই অভিযোগ নৌকার প্রার্থীর কর্মী সমর্থকদের বিরুদ্ধে।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অন্তত ২২০টি আসনে সাড়ে তিনশর বেশি স্বতন্ত্র প্রার্থী ভোটের মাঠে প্রার্থী হয়েছেন।

এবার এমনও আসন আছে যেখানে নৌকার প্রার্থীর বিপরীতে চারজন আওয়ামী লীগ নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।

ভোটের মাঠে নৌকার বিপরীতে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই এখন নানা অভিযোগ সামনে আনছেন।

সারাদেশে শতশত অভিযোগ জমা পড়েছে এবং নির্বাচন কমিশন এগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানাচ্ছে।

আলোচনায় মাদারীপুর
নির্বাচনের প্রচার প্রচারণা শুরুর পর থেকে মাদারিপুর-৩ আসনটি বিভিন্ন সময়ে খবরের শিরোনাম হয়েছে।

কালকিনি উপজেলার লক্ষীপুর ইউনিয়নের স্বতন্ত্র প্রার্থীর মিছিলে ককটেল হামলা হয়। সেখানে স্থানীয় বাসিন্দা এস্কান্দার খাঁ নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাটি আলোচিত হয়েছে নির্বাচনী সহিংসতা হিসেবে ।

নিহত এস্কান্দার খাঁ’র পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, নৌকার বিপক্ষে থাকা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থন করাটা এ হামলার অন্যতম কারণ। স্বতন্ত্র প্রার্থীও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা।

নিহত ইস্কান্দার খাঁ’র মেয়ে নিপা একথাও বলছেন যে তার পিতার সঙ্গে হামলাকীরদের পূর্বের বিরোধ ছিল।

মাদারীপুর তিন আসন ঈগল মার্কা নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংরক্ষিত আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য তাহমিনা বেগম।

নিহত এস্কান্দার খাকে নিজের কর্মী দাবি করেন তাহমিনা বেগম। তার দাবি এস্কান্দার হত্যার দুদিন আগে তার কর্মীদের মিছিলে ককটেল হামলা হয়েছিল। ওই মিছিলেও উপস্থিত ছিলেন এস্কান্দার।

“যারা বৈঠা মিছিল করছে, যারা বোমা মারছে, যারা ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য ইস্কান্দার খা’কে মেরে ফেলছে এরা কিন্তু একই ব্যক্তি। ওরা প্রথমে বৈঠা মিছিল করে ভাবছে নিবৃত করতে পারবে, দেখে যে কোনো মানুষ ভয় পাইতেছে না, এরপরে ওরা বোমা ফাটাইলো নেতৃবৃন্দ একটা ভ্যানে ছিল তাদের ওপর। বোমা ফাটানোর দুইদিন পরেই কিন্তু এই খুনের ঘটনা।”

নৌকার প্রার্থীর কর্মীদের বিরুদ্ধে নির্বাচনী মাঠে হুমকি হামলা ও সন্ত্রাসের অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলন এবং একাধিক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তাহমিনা বেগম।

তিনি আশাবাদী প্রশাসন যথাযথ পদক্ষেপ নেবে। কালকিনিতে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার সফরকে কেন্দ্র কর সেখানে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। কালকিনি থানার ওসিকেও ওই ঘটনার পর প্রত্যাহার করা হয়েছে।

“শ্রীখানে ওরা এখনো আতঙ্ক সৃষ্টি করতে চাইতেছে আশা করি যে প্রশাসনের মাধ্যমে আমরা এটাকে ক্লিয়ার করতে পারবো। লক্ষীপুরে যেরকম পদক্ষেপ নিয়েছে ওরকম পদক্ষেপ শ্রীখানে নিলে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে ভোট করতে পারবো।”

বলছিলেন তাহমিনা বেগম।

মাদারীপুর-৩ তিন আসনে নৌকার প্রার্থী আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও বর্তমান সংসদ সদস্য মোঃ আব্দুস সোবহান মিয়া। তিনি আবুদস সোবহান গোলাপ নামে বহুল পরিচিত।

স্বতন্ত্র প্রার্থী তাহমিনা বেগমকে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে অভিহিত করেন তিনি। তার কথায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন।

এস্কান্দার খুনের ঘটনাকে সম্পূর্ণ পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও পূর্ব শত্রুতার জের হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

“যেহেতু বিদ্রোহী প্রার্থী আছে তারা নিশ্চই নৌকা প্রার্থীর বিরুদ্ধে একটা অপবাদ দেয়ার চেষ্টা করবে। আসলে এই ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনাই ওটা সম্পূর্ণ পারিবারিক দ্বন্দ্বের একটা ঘটনা। জমিজমা নিয়ে দ্বন্দ্ব। ভাতিজার হাতে চাচা খুন হইছে। বাড়ি দিছে মারাত্মকভাবে রক্তক্ষরণ হইছে, হাসপাতালে যাবার পথে বোধহয় সে মারা গেছে।”

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অভিযোগ
এবার নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের মতো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচন ঠেকাতে ভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে।

ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে এবং নির্বাচনে একধরনের প্রতিদ্বন্দ্বীতা সৃষ্টি করতে আওয়ামী লীগ স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে দলের নেতাদের ছাড় দিয়েছে।

বিষয়টি দলীয় গঠনতন্ত্রের বাইরে গেলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া কোনো নেতাকে শাস্তি দেয়নি আওয়ামী লীগ।

বিএনপি না আসা এবং ডামি প্রার্থী হওয়ার সুযোগে এবার নিজ দলের প্রতীক নৌকার বিপরীতে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের শত শত নেতা।

কিন্তু নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা শুরুর পর মাদারীপুর, ফরিদপুর, পিরোজপুর, নওগা, বাগেরহাট, বরিশাল যশোরসহ দেশের বিভিন্ন আসনে নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হামলার ঘটনা ঘটেছে।

যশোরে দুটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর অভিযোগ
যশোরে ছয়টি সংসদীয় আসনের প্রত্যেকটিতে আওয়ামী লীগের অন্তত একজন করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।

এর মধ্যে যশোর-১ এবং যশোর-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রতিপক্ষের কর্মী সমর্থকদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ করেছেন।
যশোর ৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন যশোর জেলা কৃষক লীগের সহ-সভাপতি ইয়াকুব আলী। নৌকার কর্মীদের বিরুদ্ধে তার নির্বাচনি গাড়িবহরে হামলা ও ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ দিয়েছেন তিনি।

নির্বাচনী মাঠে তিনি সক্রিয় আছেন। ইয়াকুব আলীর অভিযোগ প্রতিপক্ষের হামলা ও ভয়-ভীতি প্রদর্শণের কারণে ভোটারদের মধ্যে একটা আতঙ্ক কাজ করছে।

“আমাকে ভোটাররা বলছেন যে আমরা কি ভোটের মাঠে যেতে পারবো। আর ভোট গণনা কি ঠিকমতো হবে। অথবা এরকমও বলতেছে যে ভোট গণনার পরে রেজাল্ট কি আরেকরকম হবে! আমি বলি যে আমি শঙ্কিত। তবে জনগণের ব্যাপক সাড়া এই কারণে মনোবল হারাচ্ছি না আমি”।
যশোর ৫ আসনে নৌকা মার্কার প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য স্বপন ভট্টাচার্য। স্বতন্ত্র প্রার্থীর অভিযোগগুলি তার ভাষায় অসত্য।

“কালোটাকার বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে এটা হলো বিষয়। তার তো রাজনৈতিক কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড নাই। কোনো অবদান নাই। মানুষের সুখে দুখে নাই। তারে কেউ এলাকার চেনেও না ঠিকমতো। সে আওয়ামী লীগের কেউ না। আমি মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম। এমপি ছিলাম, মন্ত্রী ছিলাম তার কী আছে? সে অভিযোগ করবেই তো। ওই সমস্ত করে সিনক্রিয়েট করবে। এখানে ওসব কোনো সত্যতা নাই।”

ভোটের প্রচার প্রচারণার শুরুর দিকে তিনি নৌকার সমর্থকদের হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ করেছেন।

“উনিশ তারিখ আমাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। এবং আমার সাথে থাকা কয়েকজনকে ব্যাপক মারধর করা হয়। উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক তার দুইটা হাত ভেঙে দিয়েছে। এছাড়াও আরো একাধিক নেতা-কর্মীকে নাজেহাল করা হয়েছে”।

মি. লিটনের কথায় ভোটারদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

“আমার পোস্টার ছিড়ে ফেলা হচ্ছে। আমার পোস্টার মারতে দিচ্ছে না। অফিস করতে দিচ্ছে না। প্রতিদিন কোনো না কোনো জায়গায় আমার নেতাকর্মীদের হুমকি দিচ্ছে। তবে বর্তমান যে প্রশাসন তারা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে।”

যদিও যশোর-১ আসনের বিভিন্ন এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর ট্রাক মার্কা এবং নৌকা মার্কার পোস্টারের সহাবস্থান দেখা গেছে।

যশোর-১ আসনের নৌকার প্রার্থী একাধিকবার আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দিন।

তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন দলীয় নেতাকর্মীদের শান্তি বজায় রাখার নির্দেশনা দেয়া আছে। সর্বপরি তাদের লক্ষ্য সাত তারিখে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানো।

“সংঘর্ষের কোনও প্রয়োজন নাই আসলে। নৌকা আছে, সবাই নৌকার পক্ষে রায় দেবে বলে এখানে আমার ক্ল্যাশের কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। আর আমি তিনবারের এমপি, চার বার আমি নির্বাচন করেছি ২০০১ সাল থেকে। মারামারি কাটাকাটি নির্বাচনী সহিংসতা এটা আমি পছন্দ করিনা, বরদাস্ত করি না এবং নিরুৎসাহিত করি সকল সময়, সকল কাজে।”

স্বতন্ত্র প্রার্থীর ওপর হামলার বিষয়টি নিয়ে তিনি দুঃখ প্রকাশ করলেও এর সঙ্গে নৌকার কর্মী সমর্থকদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন আফিল উদ্দিন।

“আমি খুবই দুঃখিত যে তাকে যেই অপমান করুক এটা আমার জন্য দলের জন্য লজ্জাস্কর বিষয়। অ্যাবস্যুলুটলি পোর্টের লেবার কেন্দ্রিক হয়েছে। ওখানে আওয়ামী লীগের কোনো দলের, কোনো ব্যক্তি একটা সাধারণ কর্মীও সেখানে উপস্থিত ছিল না।”



ফেইসবুক পেইজ