বাড়ি খেলাধুলা বদলে যাওয়া এক ক্রিকেটারের গল্প

বদলে যাওয়া এক ক্রিকেটারের গল্প

135

বাংলাদেশের ক্রিকেটে এক ধুমকেতুর আবির্ভাব ঘটে ২০০৭ সালে। ভয় ডরহীন এক ক্রিকেটারের দেখা পায় বাংলাদেশ। তামিম ইকবাল মানে মার মার কাট কাট ধরনের এক ক্রিকেটার। যার কাছে কোন বোলারই ভীতি জাগানিয়া নয়। সে যেই হোক বলটাকে মাঠের বাইরে পাঠাতে পারলেই যেন শান্তি তামিমের। সে বছরই বিশ্বকাপে জহির খানের মত পেসারকে করলেন তুলোধুনো। যা এখনো বিশ্ব ক্রিকেটে বড় বিজ্ঞাপন হয়ে আছে। ২০০৭ সালে অভিষেক বিশ্বকাপে যার ঝলকে ভারতবধ করেছিল বাংলাদেশ তার নাম তামিম ইকবাল। আর পরবর্তীতে তার ব্যাটে ভর করেই জিতেছে ভারত, পাকিস্তান কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার মত দলের বিপক্ষে।


তামিম ইকবাল খান বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন। আর যদি বলা হয় সেরা ওপেনার তবে এক চুলও বাড়িয়ে বলা হবে না। কারন বাংলাদেশের ওপেনিংয়ে এখনো একপ্রান্তে নিশ্চয়তার নাম তামিম ইকবাল। অভিষেকের পর তামিম শুরুতে ব্যাট করতে নেমে তোয়াক্কা করতেন না কোন বোলারকেই। রান তুলতেন ঝড়ের গতিতে। আর রান তোলার তাড়াতে ভুলে যেতেন নিজের ক্যারিয়ারে কথা। ইচ্ছা করলেই আরও কিছু শতক যোগ করতে পারতেন। কিন্তু উড়িয়ে কিংবা গড়িয়ে সীমানা পার করার মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি বলেই নিজের নামের পাশে আরো বেশি রান কিংবা সেঞ্চুরি যোগ করতে পারেননি তামিম। তবে যা অতীতে চলে গেছে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাই তো এখন নামের পাশে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আছে মাত্র ১১টি শতক।
তবে তামিম এখন বদলেছেন। ২০০৭ সালে যখন অভিষেক ঘটে তখন তামিমের ব্যাটিং গড় ছিল মাত্র ২২। আর গেল বছর সেই তামিমেরই গড় ছিল কিনা ৮৫.৫। আর তাতেই পরিষ্কার হয়ে যায় কতটা বদলে গেছেন তামিম ইকবাল। আর এই গড়ে সে একটি কিংবা দু’টি ম্যাচ খেলেননি। খেলেছেন ১২টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ। আর এই সময়ে দুইটি শতকের পাশাপাশি ছিল ছয়টি অর্ধশতকও। ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে যেখানে ঝড় গতিতে রান তুলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন তামিম সেখানে দলের এবং নিজের প্রয়োজনে বদলেছেন খেলার ধরণ। এখন ইনিংসের শুরু থেকে দেখে শুনে শুরু করেন। প্রয়োজনের বাইরে করেন না একটি শটও। প্রতিপক্ষ বোলারের ভাল বলটিকে যথাযথ সম্মান দেয়া আর খারাপ বলের সর্বোচ্চ ফায়দাটুকু লুটে নেওয়া যেন এখন তামিমের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। তাই তো ২০১৮ সালে বিশ্বের সেরা সব ওপেনারদের থেকেও গড়ের দিক থেকে এগিয়ে টাইগার এই ওপেনারের। ভারতীয় ওপেনার রোহিত শর্মার ব্যাটিং এভারেজ যেখানে ৭৩ থেকে সামান্য বেশি। সেখানে তামিমের গড় ৮৫ এর উপরে।

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান তামিম ইকবাল। আর ওপেনার হিসেবে তার প্রতিদ্বন্দ্বী তো তিনি নিজেই। ক্যারিয়ারে তার বহু অর্জনের খাতায় এবার যুক্ত হয়েছে নতুন এক কীর্তি। গত দুই বছরে ওয়ানডে ফরম্যাটে ব্যাটিং গড়ে শীর্ষে আছেন এই ড্যাশিং ওপেনার। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে কমপক্ষে ১০ ম্যাচ খেলেছেন এমন ওপেনারদের নিয়ে তালিকাটি সাজানো হয়েছে। গেল ২ বছরে ২৩টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলে তামিমের রান ১ হাজার ৩৩০। এই সময়ে তার ব্যাটিং গড় ৭৩.৮৮, যা ওপেনারদের মধ্যে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ভারতীয় ওপেনার রোহিত শর্মা তামিমের চেয়ে ২০টি ম্যাচ বেশি খেলে রান করেছেন ২ হাজার ৫০৮, গড় ৭১.৬৫। তালিকার তিনে থাকা পাকিস্তানের ওপেনার ইমাম-উল-হকের গড় ৬৪.৬৪ এবং তার ওপেনিং সঙ্গী ফখর জামানের গড় ৫৬.৫২। তালিকার পঞ্চম স্থানে থাকা ইংলিশ উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান জনি বেয়ারস্টোর ব্যাটিং গড় ৫৪.৮০ আর নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফেরা অজি ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নারের গড় ৫০.৪২। গত দুই বছর নয়, যদি শুধু গেল বছরকে হিসেবে ধরা হয় তাহলে তামিমের ব্যাটিং গড় আরও বেশি। এই সময়ে ১২টি ম্যাচ খেলে তার ব্যাটিং গড় ৮৫.৫। আছে ২টি সেঞ্চুরি আর ৬টি অর্ধশতকও।

এই তামিম যেন সবার মন পড়ে ফেলছেন। তাই তো দলের প্রয়োজনে এখন তিনি ইনিংসের শুরু থেকেই খেলেন ঠান্ডা মাথায়। আর দলকে এনে দেন শক্ত এক ভিত্তি। এখন আর মার মার কাট কাট ব্যাটিং করেননা। তবে সময় আর সুযোগ বুঝে ঠিকই জ্বলে উঠেন। শুরুর দিকে মিস করা বল গুলো ঠিকা িপুষিয়ে নেন তার ব্যাটিং ঝলকে। আর তাতে দলের পাশাপাশি লাভবান হচ্ছেন তামিম নিজেও। বাড়ছে রানের সংখ্যা। বাড়ছে ব্যাটিং গড়। যদিও এখনো মাঝে মধ্যে ধৈর্য হারা হয়ে যান তামিম। আয়ারল্যান্ডে চলমান ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচে ৮০ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলেছেন তামিম। সেদিন তামিম চাইলে আরেকটি শতক তুলে নিতে পারতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৪৫ তম হাফ সেঞ্চুরি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় তামিমকে। তবে ইনিংসটি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে ইনিসের শুরুতে এবং শেষে দারুণ ফারাক। শুরুটা ছিল একেবারে ধীর গতির। আর সময় যতই গড়িয়েছে ততই নিজের ব্যাটটাকে চওড়া করেছেন তামিম। আর তাতে বেড়েছে দলের রানের গতিও। এভাবে দিনের পর দিন নিজেকে বদলে ফেলছেন তামিম। এখন তার লক্ষ্য বিশ্বকাপ। আর সে বিশ্বকাপে নিজের সেরাটা দিয়ে আরো ভাল কিছু করতে চান তামিম। কারণ বিশ্বকাপে দলে অন্যতম ভরসার নাম এই তামিম ইকবাল। এখন তামিম দলকে কতদুর টানতে পারেন স্বপ্নের বিশ্বকাপে সেটাই দেখার বিষয়।