বাড়ি অদ্ভুতুড়ে ১২ বছর ধরে চুরি, ৯ গ্রুপে সদস্য ৫০ জন পুলিশকে ডাকে: তেলাপোকা!

১২ বছর ধরে চুরি, ৯ গ্রুপে সদস্য ৫০ জন পুলিশকে ডাকে: তেলাপোকা!

65

নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন লালদিঘীর পাড় জেলা পরিষদ সুপার মার্কেটের ৩য় তলায় অবস্থিত হোটেল তুনাজ্জিন আবাসিকের ১০৯ নং রুমে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ একটি চোর চক্রের ১১ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে ২টি এলজি, ১টি লোহার কাটার, ১টি লোহার রড ও ৪টি কার্তুজ উদ্ধার করা হয়।

শনিবার (২৪ আগস্ট) রাত ১১ টা ২০ মিনিটে এ ঘটনা ঘটে।

গ্রেফতারকৃত ১১ সদস্যরা হল- চট্টগ্রামের ভুজপুর থানার হেয়াকু বাজার গিলাতলি আলমের বাড়ীর মৃত অলি আহাম্মদের ছেলে মোঃ লিয়াকত হোসেন (২৪), কুমিল্লা জেলার মিলন মাস্টারের বাড়ীর মোঃ অলেকের ছেলে মোঃ আকরাম প্রকাশ আরমান প্রকাশ সাগর (২৩), কুমিল্লা জেলার দেবিদার থানার ডেঙ্গুর বাড়ীর মৃত আলী মিয়ার ছেলে মোঃ হানিফ (৪০), কুমিল্লা জেলার সুসুন্ডা বড় কবরস্থানের সাথে লাগানো বাড়ীর মালেক মিয়ার ছেলে মোঃ তৌফিক (২৬), কুমিল্লা জেলার ব্রাক্ষনপাড়া থানার দক্ষিন চান্দলা (খলিফা পাড়ার) নুরুল ইসলামের ছেলে মোঃ মাসুম (২৬), চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানার ইছাখালী মল্লিক পাড়ার সাধন মল্লিকের ছেলে নয়ন মল্লিক (২২), কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট থানার রশিদগো বাড়ীর রবিউল হকের ছেলে মোঃ মিলন (২৫), নরসিংদী জেলার রায়পুর থানার চসুবুদ্দি টুক্কু মিস্ত্রী বাড়ীর মৃত আলাউদ্দিনের ছেলে মোঃ কামাল হোসেন (২৮), কুমিল্লা জেলার কোতোয়ালী থানার আমড়াতলী বাজারের পাশে সাত্তারের ভাগিনা ও মৃত আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে জামাল উদ্দিন (৩০), কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার বাহাদুরপুর কদম আলী সরকারের বাড়ীর মৃত মোঃ কিতাব উদ্দিনের ছেলে মোঃ কামাল প্রকাশ ভুসি কামাল (৩২) ও কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার হানিফ খলিফার বাড়ীর মোঃ মজনু মিয়ার ছেলে মোঃ মিজান (২৫)।

সংঘবদ্ধ এই চোর চক্রের সদস্যরা গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাত আড়াইটার দিকে কোতোয়ালী থানাধীন জুবিলী রোডস্থ আমতল সিডিএ মার্কেট রয়েল প্লাজার ৩য় তলায় কাজী কম্পিউটারস নামক দোকানের শার্টারের তালা কেটে ১২টি ল্যাপটপ, ৫২৫ পিস পেনড্রাইভ, ৪৫০ পিস মেমোরি কার্ড, যার সর্বমোট মূল্য ১২ লাখ টাকা চুরি করে নিয়ে যায়।

গত ২৭ জুন সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন নন্দনকানন গোলাপ সিংহ লেইনস্থ নিউ লাকি ইলেকট্রিক কোম্পানী নামক দোকানের শার্টার কৌশলে ফাঁকা করে ভিতরে প্রবেশ করে ক্যাশ বক্সের তালা ভেঙ্গে নগদ ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা চুরি করে নিয়ে যায়। উভয় ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

জানা যায়, আসামীদের দলনেতা হানিফ হাতপোড়া হানিফ (৩৮)। হানিফ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকার বিভিন্ন শো-রুম, বড় কাপড়ের দোকান, বড় মুদির দোকান, সিগারেট বা বিভিন্ন ডিস্ট্রিবিউটরের অফিস, বিকাশের দোকান সহ যেসব দোকানে বেশি টাকা পয়সা লেনদেন হয় অথবা রাতের বেলায় ক্যাশে বেশি পরিমান টাকা থাকে এমন সব দোকান দিনের বেলা মার্কেটে ঘুরে ঘুরে টার্গেট করে।

হানিফের এক হাত বিকলাঙ্গ থাকায় মানুষ তাকে সন্দেহের ব্ইারে রাখে বিধায় সে এ কাজটি করে থাকে। কোন দোকান টার্গেট করার পর সর্বপ্রথম কামাল (২৮) কে সংবাদ দেয়। কামাল (২৮) এই চোর চক্রের সেকেন্ড ইন কমান্ড। কামাল (২৮) টার্গেটকৃত হানিফের দেখা দোকান চুরি করার পূর্বে দোকানে কি পরিমান টাকা পয়সা থাকবে তা কিভাবে চুরি করবে, চুরি করার পর দ্রুত সে জায়গা হইতে সরে যাওয়া সম্ভব কিনা, চুরি করার সময় কি পরিমান জনবল লাগবে, কি ধরনের যন্ত্রপাতি লাগবে, সেসব জিনিস পর্যবেক্ষন করে। পর্যবেক্ষণ করে মতামত প্রদান করে চুরি করা সম্ভব কিনা।

কামাল (২৮) এর চুরির বিষয়ে গ্রীন সিগন্যাল প্রদান করার পর হানিফ, কামাল (২৮) এর কথামতে নির্দিষ্ট পরিমান সদস্যদেরকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সংবাদ প্রদান করে। তাহারা কখনো রাতের বেলা মার্কেটের দোকানের শার্টারের প্রস্থ ছোট হলে শার্টারে লাগানো তালা কেটে প্রবেশ করে, শার্টারের প্রস্থ বড় হলে শার্টারের মাঝে দুপাশে টেনে ফাঁকা করে ১ জন অথবা প্রয়োজনে ২ জনকে ভিতরে প্রবেশ করায় অথবা সন্ধ্যা বা সকালে, অথবা মার্কেটে দারোয়ান, লোকজন থাকলে তাদের দৃষ্টি আড়াল করার জন্য পর্দা, লুঙ্গি, বিছানার চাঁদর, ছাতা ব্যবহারের মাধ্যমে কৌশলে অঙ্গভঙ্গি প্রদান করে তালাকেটে দোকানে প্রবেশ করে। সর্বোচ্চ সংখ্যক ২/৩ মিনিটের মধ্যে দোকানের ভিতরে প্রবেশ করা ব্যক্তি স্ক্রু ড্রাইভার, ছোট কোরাবারীর মাধ্যমে কৌশলে ক্যাশবাক্স লকার ভেঙ্গে দোকানের ভিতরে থাকা বহনযোগ্য মূল্যবান জিনিসপত্র, মোবাইল, ল্যাপটপ ও টাকা চুরি করে থাকে।

আসামীরা প্রায় ১০/১২ বছর ধরিয়া দোকানের শার্টার ভেঙ্গে বা কৌশলে প্রবেশ করে চুরির কাজ করে আসছে। হানিফের (৩৮) এর নিয়ন্ত্রনে ছোট গ্রুপের সংখ্যা ৯টি। এই গ্রুপের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৪৫/৫০ জন। সকলের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলার। এদের প্রধান গ্রুপ লিডার হানিফ হলেও তারা বিভিন্ন সময়ে ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়েও চুরির কাজ করে থাকে।

আসামীদের ঢাকার গুলশান, মহাখালী, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার সদর থানাধীন এলাকা, কুমিল্লা কোতোয়ালী, সিলেট কোতোয়ালী, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম শহর প্রধান টার্গেট। তারা এসব এলাকায় চুরির কাজ করে থাকে। বড় কাজ হলে হানিফ (৩৮) একাধিক ছোট ছোট গ্রুপকে একত্রিত করে চুরির কাজটি করে। হানিফের গ্রুপে কোন সদস্যরা পুলিশের হাতে ধরা পড়লে অন্য গ্রুপ দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চুরি করে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ধৃত আসামীদের জামিন, সংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় খরচ পরিচালনা করে থাকে।

কোথাও কোন চুরির ঘটনা হানিফ (৩৮) ও কামাল (২৮) ঠিক করার পর অন্যান্য সদস্যদেরকে আসা যাওয়ার জন্য বিকাশের মাধ্যমে টাকা প্রেরণ করে। হঠাৎ করে চুরির কাজটি সম্পন্ন করতে না পারলেও তারা একত্রিত করা সদস্যদেরকে যাওয়া আসা ও আনুষাঙ্গিক খরচের টাকা পরিশোধ করে।

যেকোন চুরির ঘটনায় দলনেতা হিসেবে হানিফ প্রাপ্ত চুরির টাকার তিন ভাগের এক ভাগ টাকা নিয়ে নেয়, অবশিষ্ট টাকা অন্যান্য সদস্যদের বিলি বন্টন করে এবং অফিসম্যানকে অতিরিক্ত বকশিষ এবং সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে কামাল অন্যান্য সদস্যদের চাইতে ২০ শতাংশ বেশি টাকা পায়।

চোরেরা নিজেদের ভিতর কথা বলার সময় বিশেষ সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করে কথা বলে। দোকানকে বলে তারা অফিস, তালাকে বলে আম, কার্টারকে বলে গাড়ী, চাঁদরকে বলে ঠোঙ্গা, দোকানের ভিতর চুরি করার জন্য যে প্রবেশ করে তাকে বলে অফিসম্যান, পুলিশকে ডাকে তেলাচোরা বা তেইল্লাচোরা, সংবাদদাতাকে ডাকে লাইনম্যান, চুরি করাকে বলে ডিউটি, চুরির টাকা পয়সাকে বলে ব্যবসা, চুরি করা টাকা ভাগ বাটোয়ারার সময় ১ লক্ষ টাকাকে বলে ১ টাকা।

আসামীদের মধ্যে সংবাদদাতা (লাইনম্যান) হচ্ছে হানিফ (৩৮), দোকানের (অফিস) ভিতর প্রবেশকারী (অফিসম্যান) হচ্ছে মোঃ লিয়াকত হোসেন (২৪) ও মোঃ তৌফিক (২৬)। তালা (আম), কার্টার (গাড়ী) দিয়ে কাটা ব্যক্তি  হচ্ছে মোঃ কামাল হোসেন (২৮), মোঃ মিজান (২৫), মোঃ কামাল (ভুসি কামাল), জসিম (৩২)। আসামীরা তাদের হেফাজতে আগ্নেয়াস্ত্র রাখে বাঁধার সম্মুখীন হলে ব্যবহার করার জন্য।