বাড়ি বাংলাদেশ মুক্ত গণমাধ্যম : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

মুক্ত গণমাধ্যম : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

156

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে দেশের গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন সে প্রশ্নটি প্রকট করে তুলেছে নিখোঁজ ফটোসাংবাদিক ও পক্ষকাল সম্পাদক শফিকুল ইসলাম কাজল বেনাপোল থেকে উদ্ধার হওয়ার পর হাতকড়া পরিয়ে পিঠমোরা করে যশোর নিয়ে যাওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে। বিষয়টি দেশের গণমাধ্যমকর্মীসহ দেশবাসীকে হতাশ করেছে। তিনি শনিবার (২ মে) উদ্ধার হন। সাংবাদিক কাজল গত ১০ মার্চ সন্ধ্যায় নিখোঁজ হন। পাপিয়াকাণ্ডে একজন এমপি আদালতে যে মামলা করেছিলেন তাতে সাংবাদিক কাজলের নামও ছিল।

অথচ দেশে আজ মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালিত হচ্ছে। মূলত ১৯৯৩ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ৩ মেকে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস হিসেবে ঘোষণা করার পর থেকে দেশে দেশে সাংবাদিক সমাজ আজকের দিনটিকে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হয় যথাযথ মর্যাদার সাথে।

আলোচিত হয় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে। স্বাধীনতা-পরাধীনতা নিয়ে। ঘটা করে আলোচিত হয় সাংবাদিকদের বঞ্চনা-গঞ্জনার কথাগুলো। করোনার কারণে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন পরিস্থিতিতে দেশে এবার দিবসটি পালন হচ্ছে। অথচ কী নির্মম ঘটনা আজকের দিনেও সারাবিশ্ব একজন গণমাধ্যমকর্মীকে চোর-ডাকাতের মতো করে নিগৃহীত হতে দেখলো। গত ৫ এপ্রিল আইন ও শালিশ কেন্দ্র প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী, এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট ৫১ জন সাংবাদিক বিভিন্ন পর্যায়ে হয়রানির শিকার হয়েছেন। (সূত্র : প্রথম আলো ৩/৫/২০২০)।

এইতো মাত্র কদিন আগেও ত্রাণ চুরির সংবাদ প্রকাশ করায় জাগো নিউজের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও বিডি নিউজের সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা হলো। শুধু হয়রানি করার জন্য। দীর্ঘদিন হয়ে গেলেও বহুল আলোচিত সাগর-রুনি হত্যা মামলার বিচার তো দূরের কথা তদন্তই হলো না। হাতবদল হলো তদন্ত কর্মকর্তার। পরিবর্তন হলো তদন্ত সংস্থার। কাজের কাজ কিছুই হলো না। দেশের প্রথম সারির একটি বাংলা দৈনিকের সম্পদকের বিরুদ্ধে একটি সংবাদের রেশ ধরে একই সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি মামলা হলো। আরেকটি বাংলা সংবাদপত্রের অফিস তালাবদ্ধ।

পত্রিকাটির সম্পাদকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা। জেলে থেকেছেন দীর্ঘদিন। একটি মামলায় কুষ্টিয়ার আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে শারীরিকভাবে নিগৃহীত হয়েছেন। এখন তো দেশছাড়া।

দেশে চারটি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ। চাকরি হারিয়েছেন কয়েকশ মেধাবী সাংবাদিক। মূলত ১/১১ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশের সংবাদপত্র, সংবাদমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হন। তখন গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা ভোগ করতে থাকে। বর্তমানে তো আইসিটি আইন ব্যবহার করে সাংবাদিক হয়রানির বিভিন্ন মডেল জাতি প্রত্যক্ষ করছে। দেশের সাংবাদিকরা দ্বিধাবিভক্ত। ফলে সকল সরকারের আমলেই রাজনৈতিক বিবেচনায় সাংবাদিক হয়রানিও দেখতে পাওয়া যায়। করোনাকালে সরকার কর্তৃক লক্ষকোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করা হলেও সাংবাদিকরা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করলেও তাদের ভাগ্যে কিছুই জোটেনি।

ইতোমধ্যে একজন সিনিয়র সাংবাদিক মারা গেছেন। প্রায় ৪০ জনের মতো সংক্রমিত। তাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় সরকারি কোনো উদ্যোগ এখনও দৃশমান নয়। অথচ দেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রাম ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সাংবাদিক সমাজ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এসব থেকে বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে দেশের গণমাধ্যম কতটা ঝুঁকিতে আছে। এদিকে দেশে বিকাশমান বেসরকারি টেলিভিশনের সংবাদকর্মীদের অবস্থা তো আরও খারাপ।

দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তারা সাংবাদিক হিসেবে কাজ করলেও কর্পোরেট হাউসের কর্মী হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকেন। সংবাদপত্রের সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তায় তাও ওয়েজবোর্ড আছে। কিন্তু টিভি সাংবাদিকদের তাও নেই। তারা ওয়েজবোর্ডের আওতাবহির্ভূত। সুতরাং তাদের পক্ষে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সত্যপ্রকাশ ও প্রচার অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। এদিকে এই ক্রান্তিকালে কোনো কোনো টিভি ও সাংবাদপত্র তাদের কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। অনেক পত্রিকা করোনা সংকটের সময় প্রকাশ হচ্ছে না। দেশ-বিদেশে বহুসংখ্যক সাংবাদিক চাকরি হারানোর শঙ্কায় আছেন।

একদিকে পেশাজীবীদের বিভক্তি বিশেষ করে সাংবাদিকদের বিভক্তি গণমাধ্যমকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। অন্যদিকে সংবাদ তথা গণমাধ্যমকর্মীদের আর্থিক ও পেশাগত মর্যাদা চরম হুমকির মধ্যে পড়েছে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন এবং অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াই সূচারু ও সঠিকভাবে করতে হলে দেশের গণমাধ্যমকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে হবে। দেশের সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্যপ্রবাহ ব্যবস্থাকে সকল প্রকার হয়রানিমূলক কালাকানুন থেকে মুক্ত রাখা অতীব জরুরি।

স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া দেশের সার্বিক উন্নয়ন একপ্রকার অসম্ভব। মূলত যে দেশে এখনও সরকারের পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে সরকারি বিজ্ঞাপন প্রদান করা হয়, ত্রাণের চাল চুরির সংবাদ প্রকাশ করার জন্য নাজেহাল হতে হয়। সংবাদ প্রকাশের জের ধরে গভীর রাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়, মাদকের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয় সে দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দাবি করা বাহুলতা মাত্র।

পরিশেষে একটা তথ্য দিয়ে লেখাটার পরিসমাপ্তি করতে চাই। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ফ্রান্সভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স উই দাউট বর্ডারের ২০২০ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫১তম। অবস্থান গত বছরের চেয়ে এক ধাপ কমেছে। যা আবার দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্নে। মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে সত্যিকার অর্থে গণমাধ্যম মুক্ত ও স্বাধীনভাবে দেশে কাজ করুক জাতি সেটা প্রত্যাশা করে। গণমাধ্যম স্বাধীন থাকলে আমরাও স্বাধীন থাকব। গণমাধ্যম পরাধীন হলে আমরাও পরাধীন থাকব।

প্রফেসর ড. মোহা. হাছানাত আলী

লেখক : প্রফেসর, আইবিএ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।