মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ০১:৫৮ অপরাহ্ন
                                           

একুশের আলোয় মুক্তি আসবে

একুশের আলোয় আমরা যেখানে পা ফেলেছি, আমাদের মুক্তি সেখানেই হবে। বলা হয়ে থাকে, ইতিহাস পুনরাবৃত্তিময়। তবে এই পুনরাবৃত্তি বৃত্তাকার নয়, স্পাইরাল। আসলে কোনো কিছুই পুনরাবৃত্ত হয় না। হেরাক্লিটাসের খুব বিখ্যাত কথায় আছে: কোনো মানুষ একই নদীতে দুবার গোসল করতে পারে না। এই মহাবিশ্ব, গ্রহ-নক্ষত্র সব সামনের দিকে যাচ্ছে। আমাদের নিয়তি ভবিষ্যতের সঙ্গে বাঁধা। অতীত থাকে আমাদের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা হিসেবে। প্রেরণা হিসেবেও থেকে যায়। কিন্তু অতীতে আমরা আর ফিরে যেতে পারি না।

বলা হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের পৃথিবীকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে। আমার তা মনে হয় না। এই যে ডিজিটাল জগৎ, এটা প্রায় অলৌকিক একটা ঘটনা। কিন্তু তার স্রষ্টা তো মানুষ। যন্ত্রের তুলনায় মানুষের যে অক্ষমতা, সেটাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।

একুশের আলো আমাদের রাষ্ট্র দিয়েছে, রাষ্ট্রভাষা দিয়েছে, সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের বন্ধন দৃঢ় করেছে। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই কোনোকালে প্রথম দিনে পরিপূর্ণতা নিয়ে আসে না। পূর্ণতা একটা প্রক্রিয়া। ধীরে ধীরে একে আমাদের রোজগার করতে হয়। অনেক ব্যর্থতা, অনেক পতন, অনেক ধ্বংসের মধ্য দিয়ে আমরা পরিপূর্ণতার দিকে যাই। ৫০০ বছর ধরে রেনেসাঁসের সুফলের মধ্য দিয়ে আমরা এগিয়েছি। আজকে সেই রেনেসাঁ পতনের মুখে। পতন ও অভ্যুদয়—এসবের ভেতর দিয়ে ভালোর দিকেই বিশ্বযাত্রা। একটা ছবি দেখলাম খবরের কাগজে, একটা বিশাল গ্যালাক্সি আরেক গ্যালাক্সিকে গ্রাস করে নিচ্ছে। এক গ্যালাক্সির কোটি কোটি গ্রহ-নক্ষত্র আরেক গ্যালাক্সির কোটি কোটি গ্রহ-নক্ষত্রকে হজম করে ফেলছে। আসলে গ্রাস করছে না, পরিবর্তন করছে, হালনাগাদ করছে। ধ্বংস হচ্ছে না, নতুন বিন্যাসে বিকশিত হচ্ছে। আমরাও আমাদের যা কিছু অর্জন আর যা কিছু পতন, তার মধ্য দিয়ে বিন্যস্ত হতে হতে সামনের দিকেই চলতে থাকব।

এটা একটা বিশ্বযাত্রা। সেখানে আমার ভাষা আছে, সংস্কৃতি আছে, নতুন স্বপ্ন আছে। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য উদ্যোগ আছে। উদ্যোগ থাকে বলেই চাকাটা ঘোরে। সুখ আর দুঃখ নিয়ে চাকা ঘোরে। আমরা যদি বৈপ্লবিক কিছু চাই, সেখানে আমাদের উদ্যোগ লাগবে, আত্মদান, আত্মোৎসর্গ লাগবে। ১৯৫২ সালের শহীদেরা আত্মোৎসর্গ করলেন, ১৯৭১ সালের যোদ্ধারা করলেন। এখন আমাদেরও কাজ করতে হবে। বাংলাদেশে কোটি কোটি শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে প্রতিবছর ৪০-৫০ লাখের কাছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র পৌঁছাবে বই নিয়ে। আমরা পুরো জাতির কাছে পৌঁছাতে পারব না। কিন্তু আমরা পৌঁছানোর চেষ্টা করছি শ্রেষ্ঠদের কাছে। যদি শ্রেষ্ঠদের আমরা ধরতে পারি, যদি বইয়ের আলোর সংযোগটা আমরা তাদের সলতের মধ্যে দিতে পারি, তাহলে তাদের নেতৃত্বে সমস্ত ব্যবস্থা এগিয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের দৈনন্দিন যে হতাশা আছে, সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক হতাশা, শিক্ষার নিম্নমান, অসংগতি, তার ভেতরেও সামগ্রিকভাবে আমাদের যে বিশ্বযাত্রা, তাতে জয়ের আশা আমরা ছাড়তে পারি না। জয়ের আশা যদি ছাড়ি, তাহলে তার চেয়ে পরাজয় আর নেই।

অগ্রসর মানুষ থাকে কতিপয়, বাকিরা তাদের অনুসরণ করে। তারাই উচ্চতর জাতি তৈরি করে। আজকে সবকিছু ভেঙে পড়ছে। কারণ, একটা উচ্চতর জাতি তৈরি করতে যোগ্য মানুষ লাগে। তাদের সংখ্যা এখন শোচনীয়ভাবে কমে গেছে। এটা এ জন্য নয় যে এদের আশি ভাগ বিদেশে চলে গেছে। মেধাবীরা বিদেশে গেলেই জাতি মেধাশূন্য হয় না। যে ২০ ভাগ থাকে, তারা এগিয়ে আসে। কিছু সময় বিশৃঙ্খলা থাকে, কিন্তু ওই কুড়ি ভাগ মেধাবীরা শূন্যতা পূরণ করে ফেলে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বেশ শোচনীয় পর্যায়ে গেছে। তারপরও হতাশ হব না। আমরা দেড় কোটি শিক্ষার্থীর কাছে পাঠ্যবইয়ের বাইরের সেরা বইগুলো নিয়ে গেছি। এখন এই সংখ্যা দুই কোটি হতে যাচ্ছে। এক ভাগও যদি এর মধ্যে সত্যিকারের আলোকিত হয়, তাহলে দুই লাখ। এরা নেতৃত্ব দেবে। দেশ আলোকিত হবে। সেই যে একুশের শহীদদের আত্মত্যাগ, এই যে একাত্তরে আমাদের আত্মত্যাগ, আত্মদান, তাদের সংগ্রাম বৃথা যাবে না। তবে আমাদের কর্তব্য করে যেতে হবে। মানুষ উষ্ণ রক্তের প্রাণী। আমাদের শীতকালে গর্তে ঢুকে শীতনিদ্রায় যেতে হবে, তা হয় না। আমরা চেষ্টা করব, উদ্যোগ নেব এবং বাংলাদেশকে সফল করব। আমাদের দেশ হবে একুশের আলোয় আলোকিত দেশ, বিজয়ের আলোয় বিজয়ী দেশ।



ফেইসবুক পেইজ